Wednesday, 25 June 2014

কাঁটা পথ [আমার প্রথম প্রচেষ্টার ছোটো গল্প ]



এক-
অতঃপর মাঝরাত পেরিয়ে আরেকটা দিন এলো .না , তার ঘরে নয়, পিচ ঢালা রাস্তার ওপর আলো  পড়ে , আর কিছু অতসী ফুল কে ছুঁয়ে সূর্যের প্রাগৈতিহাসিক রস্মিজালে ঢেকে যাচ্ছে শহরের পথ ঘাট. দুর্গাপুর জাগছে , আলসেমি মেখে , বয়স্ক নাগরিক দের লাঠির ঠোকায় , সান বাঁধানো চাতাল ধোয়া গড়িয়ে আসা জল এর কেন্দ্রে প্রতিফলিত হওয়া উড়ন্ত পাখির ডানায়
আলো  আঁধারী  ঘরে পর্দা উড়ছে এলোমেলো। ফ্যান ঘুরছে অবিরত ৩৬০ ডিগ্রী তেক্লান্ত।  চলছে এসি। এক ঘেয়ে শব্দ।তার ঘুম এখনো ভাঙ্গেনি কেন, জানেনা পিতামহ রৌদ্র।  বিছানার ওপর কুঁচকানো  চাদরের আদরে প্রলম্বিত ঘুম. তার একটা হাত বিছানার পাসে রাখা টেবিল এর ওপর গিয়ে পড়েছে।  কাঁচের গ্লাস সোনালী তলানি পাসে জল এর বোতল।  প্রায় খালি।  আস্তে  আস্তে  শরীর নড়ছে। আড়মোড়া ভাঙ্গছে  , এদিক ওদিক পাঁচ ছয় বার শরীরের আলোড়ন  টেবিল টাও একটু কেঁপে গেলো।  ভাঙ্গলো কাঁচের গ্লাস ধাক্কা সামলাতে না পেরে। "ধ্যাত তেরিকা , ওফফ "ধরমর  করে উঠে বসলো সে. অজান্তেই তার বাঁ  হাত চলে গেলো  ঠোঁটের ওপর।  একটা ব্যথা  টের  পেলো    অনাবৃত উর্ধাঙ্গে একবার চাদর টা  জড়িয়ে নিয়ে বিছানার পাশে এসি সুইচ  বন্ধ করতে যেই যাবে , ঠিক তখুনি মোবাইল টা বিছানার  ধার থেকে পরে গেল মাটিতে। আবার বিছানার উল্টো দিক এসে  সে মোবাইল টা  তুলে সুইচ  অন করলো, সময় সকাল নটা। স্ক্রীন  সেভার  ভেসে উঠলো বার্তা। "রাত বাড়লো  চুপি চুপি /তোমার স্বপ্ন এর নই ইতি "."একটু হাসলো সে , একটা অজানা নম্বর , সে চেনেনা। কিন্তু তার মনে ভাবনা টা  লেগে রইলো।  ওয়ার্ডরোবে আয়েনায় নিজেকে দেখে নিয়ে হাই তুলে ঢুকলো টয়লেট এ।  ব্রাশ  নিয়ে।  পড়ে  রইলো ভাঙ্গা কাঁচ, অগোছালো বিছানা




দুই -

স্ক্রামবেল্ড  এগ আর ব্লাক  কফি মগ নিয়ে সে এসে বসলো ডাইনিং . তাদের এই ফ্ল্যাট টা  বেশ খোলা মেলা। কালকে অরি  রেন্ট ট্রান্সফার করেছে স্টেটস এ ল্যান্ড লর্ড এর একাউন্ট , জানা হয়নি  সেটাও।  সামনের ফ্ল্যাটের  ব্যালকনিতে এখন বাচ্ছার  জামাকাপড়, ব্রা  , চাদর ইত্যাদি মেলেছে  কাজের মাসি। তাদের নিজেদের অবশ্য  কাজের লোক নেই, বলা ভালো রাখাটাই একটা বড় ঝামেলা। দুর্গাপুরে তাও না হলেও বছর হলো. পড়তে আসা ইস্তক শহর  টা  কে সে ভালোবেসে ফেলেছে , যেমন কলেজের  কাফেটেরিয়াতে  গীটার  হাতে অরি কে দেখে সে মুগ্ধ হয়ে গেছিলো  .ফার্স্ট ইয়ার এর ফেস্ট , নাম তাও মনে আছে -"fiesta ".কলেজের  ফেস্ট অরি গান গাইবে গীতের বাজিয়ে, বব ডিলন।তার ছিল কবিতা   আরো অনেকের মাঝে কেনো  কে জানে অরি ওর  টেবিল এসে কথা বলেছিল। তখন ফার্স্ট ইআর।  সে বি.বি.এ আর অরি কম্পিউটার এপ্লিকেশন   . তবে আর বি.বি.এ করে এম.বি.এ শুরু হলেও শেষ হলো কোই ?মাঝ পথে পরা ছাড়ল , কবিতা নিয়ে মাতামাতি , নেশার ঘোরে  ডুবতে ডুবতে  সে প্রথম বার পেল চুমুর স্বাদ। অরির বুকে আছড়ে  পরে কেঁদে ছিল সে যেদিন তার বাবা তাকে বলেছিল একটা পাপ , জন্ম জন্মান্তরের পাপ. সেদিন অরি তাকে দিয়েছিল আশ্রয়। ইতিমধ্যে তার কিছু কবিতার বই বেরিয়েছে, কলকাতার পথ সে ভোলেনি, কলেজ স্ট্রিট সে যায় , কিন্তু বাড়িতে কখনো নই, অরি কে কেউ মেনে নেয়  নিদুর্গাপুর ল্যান্ডমার্ক আর ক্রসওয়ার্ড হওয়াতে যে কি সুবিধা হয়েছে।  আর এখন অনলাইন মার্কেটিং এর যুগে বাড়ি বসেই প্রায় অনেক কিছুই পাওয়া যায়. এর মধ্যে তার জন্যই অরি দুর্গাপুরেই একটা কোম্পানি তে কাজ নেয় . যদিও অনেক কম মাইনা , কিন্তু দুজনেই যে দুর্গাপুর কে বড্ড  ভালো বেসে ফেলেছে। তাদের দুজনের নিস্চিন্ত্য নিরাপদ ঠিকানায় তারা একত্রে তিন বছর. অরির মা বাবা ডিভোর্স  হয়ে গেছে। অরি তখন ১৪ বছরের। অরির প্রতি তাদের কোনো আর দায় নেই, অরি ও বেঁচে গেছে ওদের কাছে অর যেতে হয় না বলে। এদিক থেকে অরি হারানোর আর কিছু নেই. প্রথম  একসাথে থাকা শুরু করার পর সেই অসম্ভব্ভ ভালবাসাবাসির  দিন গুলো তে অরি কাছে সে শাম হয়ে গেছিল।  এই বিধান  নগরের অভিজাত এলাকাতে ফ্ল্যাট নেবার সময় তারা বার ভাবেনি  যে তাদের সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট  সংজ্ঞা নেই, কোনো কমিটমেন্ট নেই, শুধু  যা আছে তা হলো শিকারীদের হাত থেকে নিজেদের কে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই আর নিবিড়  ভাবে দুজন দুজনের কাছে থাকা। আর এই ফ্লাটের উল্টোদিকের বিবাহিত দম্পতি  মতো তাদের স্বপ্ন অনেক-সেই স্বপ্নে হলুদ জামা, স্ফিত বুক, ভিজে ন্যাপি, ফিডিং বোতল , আরো কত কি. বাচ্ছাটা মনে হয় ১ মাসের হলো. গত মাসেও ও দেকেহ্ছে যে একদিন সবাই হয় ছয় করে মহিলারা উলু দিছিল, শাঁখ বাজলো , আর তার দুদিন পরেই এম্বুলেন্সের তীব্র শব্দ মাঝে রাতে সারা ফ্ল্যাট কে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। গতকাল তিনটে হিজরে এসেছিল ওকে নাচাতে। ভদ্রলোকের ফ্ল্যাট , তাই বেশি  দরাদরি করাটা অসন্মানের। সে দেখছিল যে একটা হিজরে এত সুন্দর যে বিধাতা  আরেকটি কিছু বেশি  সময় দিলে হয়তো  সে নিজেই জন্মদাত্রী হবার আনন্দ উপভোগ  করতে পারত। ইতিমধ্যে কাজের মাসির জামা মেলা হয়ে গেছে, একবার তাদের ফ্ল্যাট এর খোলা জানালর দিকে উঁকি মেরে তাকে দেখতে পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেলো।  কফিও শেষ টেবিল  পরিস্কার করতে গিয়ে তার চোখে পড়ল উল্টো দিকে একটা কাগজে অরি লেখা "will  be late , gonna for meeting , may not  come .see you  to morrow , with love  P ." কাগজটা একবার দেখেই সে বিন বক্স ছুঁড়ে ফেলে দিলো।  স্নানে যাবার আগে ঘর পরিস্কার করে , ওয়াশিং মেসিন সব বাসী জামা কাপড় কাচতে দিল. অরি এর প্যান্ট এর পকেট হাত দিয়ে দেখল কিছু জরুরি কাগজ আছে কিনা।  একটা চিরকুট পেল.লেখা -"আজ কিন্তু অফিস নয়.". ব্যাপরটা সে আঁচ করতে পারল কিছুটা।  অরির নতুন বান্ধবী সীমানা। অসম্ভভ সুন্দরী। অরি তাকে আলাপ করে দিয়েছিল  একটা পার্টি তে. তার কবিতার প্রসংশা করেছিল মেয়েটি, লজ্জায় কথা জড়িয়ে গেছিল তার, সেই অপার্থিব সুন্দরের সামনে , তার গালে কমনীয়তার অভাব খুব প্রকট হয়ে পড়ছিল। নিজেকে আড়াল করে নিয়ে ছিল সে...বাবা ঠিক বলত সে একটা পাপ. নিজের অজান্তেই  তার হাত  একবার গাল কে স্পর্স করলো। নাহ , এবার থেকে রোজ শেভ  করতেই হবে.
স্নান সেরে বেরিয়ে এসে ড্রায়ার চুল শুকিয়ে নিয়ে একটা পনি টেইল করলো।  হাতে একটা বিডস  এর ব্যান্ড বেঁধে নতুন পাঞ্জাবি তা গায়ে চড়াল সে , যাতে  নিজের হাতে অনেক যত্নে সে লিখেছে লাল রং দিয়ে "মৃত্যুর নেই কাল, আমার নেই আড়াল ".জিন্স এর প্যান্ট পরে আরেকবার আয়েনায় নিজেকে দেখল সে, রুপকথা কেন যে তাকে বলত "তোকে আমার হিংস্য়ে হয় রে, কি সুন্দর স্কিন তোর , আমাকে ধার দে না !"  সীমানা  এত সুন্দর !সীমানার মত সুন্দরীরা , সত্যি কাক ময়ুর পুচ্ছ  পরলেই ময়ুর হয় না. আজ বিকেলে সৃজনী তে তার কবিতা পাঠ  আছে. কিন্তু সেত সন্ধ্যে ৬তার সময়তবুও সে বেরোবে বলে ঠিক করলো। না হয় ঘুরেই দেখবে বসন্তের দুর্গাপুর কে আরেকবার, বার বার. বসন্তের চেনা ছবি গুলো ব্বারবার নতুন করে সাজে, সেই এক রং, সেই গন্ধ, কিন্তু প্রতিবার তার আগমনের জন্য মানুষ অপেক্ষা করে থাকে, মানুষের জীবন তো অন্তহীন অপেক্ষা।



 তিন
কবিতা পাঠ শেষ হলো দুটো কবিতা পর যখন সে থামলো , বুঝতে পারল আজ তার স্বরক্ষেপ ঠিক ঠাক হয়নি অথচ এই কবিতা দুটো বারবার সে করেছে অভ্যাসে, না দেখে ; অনুভুতির মধ্যে ঢুকে গেছিল এই কবিতা "মেঘবালিকা" আর "আট বছর আগে একদিন"  সে ভাবছিল তাহলে কবিতাও কি ছুটি চায় মাঝে মাঝে
প্রশ্ন ভাসছিল ঠোঁটের আড়ালে - পূর্ণতার মাত্রা কি চির অধরা।  কেনই বা এমন প্রহেলিকা?
মঞ্চ থেকে নামার পর সামনের কফি কাউন্টার থেকে কফি আর এক প্যাকেট চিপস নিয়ে সে বেরিয়ে এলো সৃজনির মূল ফটক দিয়ে। সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছে লাল আগুনের আবরণ ভালবাসার থেকেও বেশী সংগ্রামী প্রতিপন্ন হলো তার।  অথবা সবুজ  পাতার ফাঁকে লালের স্পন্দন এতটাই অদ্ভুত যে প্রাণী এবং উদ্ভিদের  আসল দুটো রং কি সুন্দর ভাবে একত্রিত অথচ পৃথক সত্তায় উজ্জ্বল। সেই গাছের তলায় সে এসে একটু বসলো। কফি শেষ।  চিপসের প্যাকেট খুলে সে একটা মুখে ভরতে যাবে এমন সময় তার সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল খুব চেনা ইন্ডিকা ভি ২।
 মুহুর্তের জন্য তার শ্বাস থামল। একটা খুব চেনা পারফিউম এর গন্ধ এসে তার নাকে ধাক্কা দিলো। মাথাটা ঘুরিয়ে গেলো। ভাগ্যিস বসে ছিল সে। বমি কে এটি কষ্টে গিলে নিয়ে তাকালো সে গাড়িটার চলে যাবার পথে।

অরির তো আজ সন্ধ্যেই অফিস একটা জরুরি মিটিং ছিল ওর  অফিস তো এখানে নয়  সে তো মেন গেটের কাছেআর অরি তো মারুতি নিয়ে বেরিয়েছে , ইন্ডিকা তো সীমানার
মন কে তাও বোঝাবার চেষ্টা করলো হয়তো  জিটি  রোড ধরে মেন গেটে ওরা চলে যাবে। কিন্তু তাতেও বাধ সাজছে মিটিং এর সময়। এখন তো প্রায় সরে সাত টা।  তাহলে মিটিং শুরু  হলো কখন আর শেষ বা কবে? সে ঠিক করলো আজ অরি কে সে আর ফোন করবে না , কি দরকার ওকে বিরম্বনায় ফেলার।  আনন্দ পার্ক এর সামনে অনাবিল মজার হাতছানি তে মগ্ন সুবেশা তরুণ তরুণী , পরিবার , বাচ্ছা  গুলোর বিরামহীন অনর্থক প্রকাশ।ওরাও বেশ কয়েকবার এসেছে, নানাধরনের রাইড এ মেতেছে। তবে আনন্দ বেশি পেত অরি. অর তো আদভেনচার  রক্তে মিশে আছে,নয়তো ওর জোর না পেলে তারা কখনোই একসাথে এক ছাদের তলায় পাঁচ বছর কাটাতে পারত না। 
সে উঠে দাড়ালো। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে সেটাকে রিংটোন মোড দিল. ইনবক্স টে  মেসেজ।  সেই অজানা নম্বর।  আজব ব্যাপার। একই তার কোনো ভক্ত?
"ভালো থাকবেন"
"রাত নামলো  কার্নিস বেয়ে / প্রত্যক্ষ করা যাক অবিশ্বাস."
" পিয়া ভোলো অভিমান "
একমাত্র সেসের লাইন তাই একটা গানের। তার প্রিয় খুব.
কৌতূহল হলেও সে আর রিং করলো না বা মেসেজ দিলনা
কতই তো আসে যায় , কবিতার মোহতে , অথবা স্বর এর মুগ্ধ ছোঁয়া
 মাথা তা আরেকবার ঘুরে উঠলো অটো  স্টান্ডের দিকে যেতে গিয়ে। প্রেসার মনে হয় বেশ বাড়ছে। গতবছর থেকে হরমনের অসুধ গুলো নেবার পর এই নানা উপসর্গ , মাথাঘোরা ,বমিভাভ লেগেই আছে. dr .পুরকায়ত তাকে বহুবার সাবধান করেছিলেন, ভেভে দেখতে বলেছিলেন, কিন্তু সে ঠিক ই করে নিয়েছিল  শেষ চেষ্টা করবেই অরির সুখের জন্য।
 এদিকটা এল আলো আঁধারী।  সামলাতে গিয়েও সে পারছেনা নিজেকে ধরে রাখতে। পরে গেলো।  ব্যাগ থকে ছিটকে বেরিয়ে এলো জেমস বলদুইন।  গত বছর জন্মদিনে অরির উপহার। জয় গোস্বামী।নিজের লেখা কবিতার ডায়রি , সিগারেট এর প্যাকেট,  জলের বোতল,  পেন অন্ধকারে ঠিকানা হারালো
হাত ঘসে গেল পিচ রাস্তায়। আসেপাশে কাছে পিঠে কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। কেউ নেই, শেষ তার চলার ক্ষমতাও।এইসব ভাবছে  যখন সে, সেই মুহুর্তে পাশ দিয়ে যাওয়া একটা ছায়ামূর্তি থমকে দাঁড়ালো।
-আরে বাপ রে , কি হলো বাবু ? ঠিক আচ তো? কি হলো এমন ধুপ করে পরে গেলে কেন? মাথা ঘুরছে নাকি?
কথা গুলো ওর কানে গেলো , একবার উপর দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো। মুখটা যদিও স্পষ্ট নয়, তবে গলার আওয়াজ পোষাক যথেষ্টই বিসদৃস্য।  আসতে আসতে সেই ছায়ামূর্তির অবয়ব ক্রমশ স্পষ্ট হলো. চিনতে পারল সে , পরশু তাদের উল্টো দিকের ফ্লাটের যে হিজরে তা এসেছিলো সেই বেগুনী  জমকালো জার্দৌসী শাড়ী তবে পারফিউম টা বেশ মিষ্টি , ঝিম ধরানো




চার-
এরকম হয় নাকি মাঝে মাঝে ? এটা  ভালো না।  কোন  সময় রাস্তায় পরে মরবে নিজেও টেরটি পাবেনা।  আরে কি হলো? কথা গুলো কি কানে যাচ্ছে ?
-হুম
কি হুম ? কি হয়েছে? আচ্ছা। থাক বলার দরকার নেই।  তোমাদের মতো বাবু মানুষ রা তো চুপ থেকে ভদ্রতা দেখাও কিনা
বসন্ত এর হাওয়া বাড়ছে। দুরের ফ্ল্যাটের আলোর মধ্যে   জীবনের অবিশ্রান্ত রেখাপাত। শহুরে কায়দায় অভস্ত্য নতুন নাগরিক জীবনের অলিন্দে ঘটে চলা মুহুর্মুহু সুখ দুক্ষ ভালবাসা ঘৃনা হাসি কান্না একপেশে। বোঝা যায় না হাসির মাঝে কান্না গোপন সুরঙ্গ এর দিক নির্দেশিত কিনা অথবা ভালবাসা বিনিময়ের ভিতে দাড়িয়ে
 এই যে তার পাশে যে হিজরে বসে রয়েছে তার নাম এখনো জানা হয়নি। সে কি কারণে তাকে তুলল রাস্তা থেকে সেটা এখনো অজানা আবার শুধু তাই নয় , সমস্ত ব্যাগ তার গুছিয়ে দিয়ে , জলের বোতল খুলে তার মুখ মাথা ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুছিয়ে তাকে ধরে ধরে এনে বাস স্ট্যান্ড এর বেঞ্চ বসিয়েছে। ভির যে খুব বেশি তা নয়, তবে যারাই রয়েছে দৃশ্য তা তে যে বেশ মজা পাচ্ছে তা তাদের ঈশারা, চাহনি বাঁকা হাসি, বিদ্রুপের দৃষ্টি তেই স্পষ্ট। যেন সে কোনো একজন জোকার, জন্তু কে নিয়ে খেলা দেখাতে ব্যাস্ত্য। লোকের চোখ এড়ানোর জন্যই সে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল.
হিজরে  এখন চুপ করে আছে...বুঝি বা বুঝতে চেষ্টা করছে সে কি ভাবে তাকে নিছে। পরিস্থিতি কে অযথা ভারাক্রান্ত্য করে লাভ নেই।
-তোমার নাম কি?
- কথা বেরোলো ? বিজলি।  গুরুমা দেওয়া  নাম.
-ও।  আর তাকে কি জিজ্ঞাসা করা যায় সেটা তার মাথায় এলো না.
আবার চুপ.
তোমার?
শাম্ব।  বলে সে ঘড়ির দিকে একবার তাকালো। সরে ৮টা। আরেকবার  আরচোখে  বিজলীর দিকে তাকাতে নজরে এলো বাঁ  দিকের গালে একটা কাটা দাগ।
-ওটা দাদু করে দিয়েছিল , বছর বয়েসে। যখন আমাকে নিয়ে গেল ঘর থকে টেনে সেইদিন .তার আগে মা অনেক কষ্টে আমাকে লুকিয়ে রাখত। কিন্তু জানাজানি হয়ে তো গেছিলো। হিজরে বাছা র ঘরে থাকা নিয়ম না, আলাদা সমাজে তারা থাকে।। পাপ এর খবর কি আর চাপা থাকে? তরপর তো। .....
হঠাত করে ধরা পরে যাওয়া খরগোসের মতই তার ভিতর  ছটফট করে উঠলো। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল অরির কোনো কল এসেছে কিনা। জানত আসবেনা , আসলে জাতিস্মর ঠিক জানান দিত বেজে বেজে।তাও কি মনে করলো সে. নাহ।  সুধু স্ক্রিন সেভার  এর চলমান ছবি।
-বিস্কুট খাবে?
উত্তর না দিয়ে সে হাত বাড়ালো।
-একাই থাকা হয়?
প্রশ্ন তা শুনে ধাক্কা লাগলো তার। কোনো জবাব দিল না।
উত্তর না পেয়ে বিজলি চুপ করে গেল. শাম্ব  জানে আর বাকি পাঁচ জনের মত বিজলি তাকে ভেবে নিয়েছে প্রেমে ঝাড়  খাওয়া পাবলিক
-তুমি এদিকেই থাকপ্রশ্ন এড়িয়ে যাবার এর থেকে সহজ রাস্তা ওর  সামনে আর ছিলনা
-না না পাগল নাকি? কি যে বল? ভদ্র সমাজ, বড়লোক সমাজ আমাদের জায়গা কে দেবে ? মানুস দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেয় , অপয়াদের কেউ ফ্ল্যাট দেবে? এসেছিলাম গুরু মা কে দেখতে , নার্সিং হোমে  , কাল অপারেসন হবে।  টাকাটা আজ দিয়ে গেলাম। ৩তে নার্সিং হোম ঘুরে এই খানে শেষে ঠাই  হলো। এখন বাস ধরে ফিরব , আর বাস না পেলে অটো  আছে, নিয়ে নেব. আমাদের জন্য রেট  বেশি , অপয়া কিনা।টাকা পকেটে থাকলে অবস্য তুমি পয়া.  সরকারী হাসপাতাল গেলাম বলল বেড  নেই. সব ছিলো , দালাল কে বললাম টাকা দেব।  শুনলো না। আমাদের হাসপাতাল নিলে আরো রোগ বাড়বে।
বাচ্ছা  গুলো পর্যন্ত্য ঢিল মারছিল।
-সে এক মনে কথা গুলো সুনে যাচ্ছে। আর পুরনো স্মৃতিরাও ফিরে আসছে বারবার। অরির সাথে থাকা শুরু করার পর কম করে না হলেও মনে হয় লক্ষ  লোকের বিদ্রুপ তাকে সইতে হয়েছে। বাবা , দাদা রা বেঁচে গেছে তাকে তাড়িয়ে দিতে পেরে. একমাত্র মা ছিল, মা যার কাছে সে কাঁদতে পারত, কবিতা বলতে পারতো , গান করতে পারত।  মা আর নেই.
  -তাও তোমাদের জন্য তো কাজ জুটছে, সরকার তোমাদের জন্য ভাবছে। এরপর পরিস্থিতি পাল্টাবে
-হুঃ , তালেই হলো. জন্ম দাগ দেখেছো ? মেলায় না।  আমরা দাগী। কেউ জায়গা দেবেনা। কেউ না। তবে যদি সত্যি ভালো কিছু হয় ইচ্ছা আছে একটা মেয়ে কে দত্তক নেবো।  পেটে ধরতে পারবনা। মানুষ তো করতে পারব
শাম্বর আশ্চর্য্য লাগা শ্রদ্ধায় রুপান্তরিত হচ্ছে। বিজলীর একটা বাজে কথা নেই, পরিশীলিত ভদ্র ব্যবহার।
-তোমার কাছে একটা জিনিস চাইব দেবে, অবলীলায় বিজলি বলে খলখল করে হেসে উঠলো
-কি?
-একটা কবিতার বই।  তোমার ব্যাগ তুলতে গিয়ে দেখলাম।
-ওহ নাউ. বলে সে বই তা এগিয়ে দিল. মেঘ বালিকারা মুক্তি পেল কবির ঝোলা থেকে
-চল তোমাকে অটো  স্ট্যান্ড অব্দি এগিয়ে দি, আবার যদি পরে যাও.
 দুটো দাগ অদৃশ্য দৃশ্য হচ্ছে বার বার আলো  আন্ধারির মাঝে
জীবনের চিত্র্যনাট্য অদ্ভুত , পরিচিতর মাঝে অপরিচিত সংলাপ।
প্রকারন্তরে অন্য জীবনের কাছে হাত পেতে চেয়ে নিতে পারা যায় আঁজলা  জল।
সময়টুকু পরে পাওয়া নয়, আড়াল থেকে লক্ষ্যভেদ করে চলে মেঘনাদ।
বৃহন্নলা মোহিনী আড়ালে বাড়তে থাকে ক্ষত।
বন্যায় ভেসে থাকা  জীবনের খড়কুট।
রাতের দুর্গাপুরের পরিনত শরীরে পতঙ্গের ওরা উরি। কনক্রিটের শহরের রাস্তায় ঝলকানো রূপের আনাগোনা শুরু হচ্ছে। বাসন্তিক চাঁদ ব্যাস্ত্য নিজের খেয়ালে। বেশ কিছু অটো  ওয়ালা রা খিনি টিপছে, কাছে যেতেই নাকে লাগলো খৈনির ঝাঁজ। বিজলি আর তাকে দেখে ওদের হাঁ  মুখ বন্ধ হলনা, নিজেদের মধ্যে চাওয়া চাওয়ী  করতে করতে একজন অন্জনকে ধাক্কা মারলো বিজলীর এগুলো কোনো নতুন দৃশ্য নয়. কিন্তু সমস্যা তা হচ্ছিল শাম্বর যে মুহুর্তে অটো তে সে বসতে যাবে তার ফোন তা বেজে উঠলো.জাতিস্মর এর ডাক নয় , এটা  মেঘ পিওন এর যাত্রাঅচেনা নম্বর
-হ্যালো
-এক্সিডেন্ট ?
কার? -অরিন্দম মিত্র ? -কবে?-কোথায়?-কখন?
বাকি শব্দ গুলো তার কানে আর ঢুকছে না.অরির এক্সিডেন্ট , সীমানা মৃত।  অরি যেকোনো সময়.
 জীবনের আবার নতুন ক্লায়্মাক্স .



পাঁচ-
হাসপাতালের ভোর  এরকম ব্লিচিং গন্ধ মেখে, এম্বুলেন্সের হুটারের শব্দে রক্তমাখা তুলো, সিরিঞ্জ এর আবর্জনা বেয়ে সকাল নামছে বিধান নগর হাসপাতালে। এদিক ওদিক কিছু লোকের জটলা।  দেহাতি মানুষ জনের বিচিত্র কথোপকথনের মধ্যে চিন্তার প্রকাশ। মাতৃযান এসে সশব্দে ঢুকে গেল কেউ একজন ছুটে স্ট্রেচার নিয়ে এলো।  নতুন জীবন আসছে, তার জন্য সাজানো হচ্ছে ভূমি।.শাল  গাছে শালিখ কাকের ঝগড়া নতুন পাতার আড়ালে। মর্গের সামনে সে দাড়াতে পারেনি , বিচ্ছিরি গন্ধ। মানুষের আর ইন্দুর বা কুকুরের মৃত দেহর  পন্চনের পার্থ্যক্য নেই. বিজলি হাত ধরে সে এক কোনায়  বসে আছে. সীমানার বাড়ির কিছু লোকজন।ওর মা বাবা মনে হয় আসেনি। আসতে পারা খুব সহজ স্বাবাভিক নয়। তাদের মুখ থেকেই সে শুনলো সীমানা আর অরির এনগেজমেন্ট জুন মাসে। পরিস্থিতি তাকে অসার করে দিছে, অনুভূতি গুলো যেন পালাচ্ছে দ্রুত। নাহ কাঁদতে পারেনি সে. কথাও বলতে পারেনি। শুনে গেছে মৃতের না বলা কাব্য।
-চল পুলিশ এর কাছে যেতে হবে।
আচমকা বিজলীর কথায় কিছুটা সম্বিত ফিরল তার।  যেতে তো তাকে হবেই। ডি. পি. এল থানাতে।কিন্তু সে পালাতেই চেয়েছিল ।অরির মৃত্যু সঙ্গে সঙ্গে হয়নি, বেশ কিছুক্ষণ সে বেঁচেছিল হসপিটালে নিয়ে আসার পর. কিন্তু তাকে যখন  ভেনটিলাসনএ নেবার জন্য একটা মাল্তিস্পেসালিতী হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন ই সে মারা যায়, বিজলীর ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানছিল। আর কি বলেছে বাকিটা সে শোনেনি। শাল গাছের তলায় তাকে জোর করে বিজলি ওকে নিয়ে গেল থানায়।



ছয় -

নাম-সাম্ব মুখার্জী
ঠিকানা -/, বৈদিক আয়াপার্ত্মেন্ট
পাম্প হাউস

-অরিন্দম মিত্র আপনি কে হন?
এই প্রশ্ন তা যে প্রথমেই আসবে সেটা তার মাথায় আসেনি।
-বন্ধু
-ওনার বাড়ির লোককে   বলুন। এছাড়া আমাদের  সম্ভভ নয়.  .
-স্যার  একটু দেখুন না, মানে অরিন্দম মিত্র কেউ নেই ইনি ছাড়া। বাড়ির লোক দূর্গাপুর থাকেনা
-তো ডেকে  নিন ফোন এ  জানান
বিজলীর মুখে অসহ্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। শাম্ব মুখ নিচু করে বসে ছিলো। তার গাল বেয়ে নামল দু চার ফোঁটা জল. মোচার চেষ্টা  করলনা.তবে হাতের তালু দিয়ে ঠোঁট আর মুখ চেপে ধরে রাখল, যাতে আর কান্না না আসে.    .
-চলো ,  
বিজলি দমবন্ধ করা ফাইল, অপরাধী আর উর্দি পরা পুলিশ এর থেকে তাকে নিয়ে আসার চেষ্টায় ডান হাত ধরলো।
 যেহেতু এক্সিডেন্ট  ব্রিজ এ উঠবার মুখে হয়েছে, তাই কেস অনিবার্য্য ভাভে ডিপিএল থানায় এসেছে। থানার বাইরে বেরিয়ে এসে বিজলি চা খেল।
-আরেকবার হাসপাতাল যাবে নাকি?
-নাহ।
-কেন?
-লাভ নেই.
-লাভ ক্ষতির প্রশ্ন টানছ?
-শুনলেই তো অরির বাড়ির লোক না আসলে কোনো লাভ নেই? আমি কি করতে পারি বলবে বিজলি ? বলেতে বলতে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল. -কেন যাব? কি আমাকে বলেছিলো  যে কাল ব্রীজে  ঘুরতে যাচ্ছে ? আমি কি ওকে আটকাতাম?
বিজলি ওকে এক ধরে বেঞ্চের ওপর টেনে এনে বসালো।   থামেনি।
-আরেকবার চল বড়বাবু কে বলে দেখি কি যদি কিছু করা যায়?
বিজলীর মুখে আত্মবিশ্বাসের ছটা না থাকলেও অর কথা বলার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যাতে তার আশা আবার জেগে উঠলো। যদি শেষ বারের মত কিছু একটা করা যায়।
বিজলি আর সে আরো কিছু কৌতহলী চোখের সামনে দিয়ে পুনরায় বড়বাবুর ঘরে ঢুকলো
-কি ব্যাপার ? আপনাদের তো যেতে বলেছিলাম না? বললাম তো আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভভ নয়.
-সার একটু দেখুন না, ওরা একসাথে অত বছর হলো আছেন।
বিজলীর কথা শুনে পুলিশ অফিসার এর চোখে একটা বিদ্রুপ ফুটে উঠলো
-আছেন মানে?ওহ আচ্ছা আচ্ছা কি সব বলে যেন ?সেই কেস ? ওহে রুদ্র একবার এস দেখে যাও থানা তা সার্কাস পার্টি ঠেক  হলো  দেখছি । সকাল সকাল ছক্কা পাঞ্জার খেলা বসেছে
বড়বাবুর কথাতে বিজলীর নাকের পাতা ফুলতে সুরু করেছে। তবু যতটা সম্ভভ গলার স্বর কে নামিয়ে সে বলল
-দেখুন স্যার , আপনি চাইলে সব হবে, অনার বন্ধুর একটাই ইচ্ছা দাহ করার অধিকার টা  যেন সে পায়।
-দাহ? আরে মশাই, আমাকে আগে এটা  বোঝান যে কোন প্রমানের বদলে আমি ডেড বডি এর হাতে তুলে দেব. প্রমান কি আছে যে এরা বন্ধু? কোনো চিঠি? কোনো বিল? কোনো কিছু যা দিয়ে প্রমান হয় এরা সব নাকি একসাথে  কাটিয়েছে।
অরিন্দম   রায়ের পান্ট এর পকেট থেকে একটা গাড়ির  সার্ভিসিং এর বিল আমরা পেয়েছি, তাতে অনার নাম আর ঠিকানা লেখা আছে, আর গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর তা কার নাম আছে সেটা না জানতে পারলে আমাদের কিছু করার নেই.অনার নাম যদি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করানো থাকে তবে মি মুখের্জী গাড়ি পেয়ে যাবেন, তাও কোর্ট এর উঠোন পেরিয়ে সেটা তার হাতে আসবে
-স্যার ওরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল, একসাথে ফ্ল্যাট থাকতো।  মানে ? মানে সার -
-থাম আর বলতে হবে না. বুঝেছি, বেসি বকলে  পিছনে কেস দিয়ে দেব. সালা কি যেন বলে হোমো ', হ্যা হ্যা হ্য়াআ... 
ও কি করে থাকা হতো ? কেমন লাগত ?  ? ভালো আরাম সব ? কোনো ঝামেলা নেই, বাছাকাচ্চা নেই.মজা লোট। অফ লাইফ মাইরি সব.  হ্যহ্যাআআ। .. এখানে ফালতু  সেন্টিমেন্ট নিয়ে আসবে না।  ডেড বডি পোস্টমর্টেম হবে, লিগাল ক্লাইম  যদি আসে তবে বডি তাকে দেব,আর নয়তো বেওয়ারিশ লাশ গাদায় যাবে । আগুন তা পেয়ে যাবে

সাম্বর সঝ্য়ের সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে। এক ছুটতে সে বেরিয়ে এসে হর হর করে বমি করলো। ভোর বেলার জল র সাথে অ্যাসিড মিশে বেরিয়ে এলো গলা বুক জিভ পুড়িয়ে দিয়ে। বাইরে কোকিল ডাকছে, রাধা চূড়া গাছে হলুদ ফুল।
 "শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা "...অবিরল। 
 



 
              




No comments:

Post a Comment

যাঁরা হঠাত করেই খাওয়াতে চায়

  হাঁটু মুড়ে বসো, মুড়িমাখা হাতে দেবো- ঝাল মুড়ি। চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে সাথে আচারের টুকরো আম। পা ছড়িয়ে বসো তারপর, মেলে দাও গল্পের শাড়ি। অবাক বিস্...